দেশটাকেও তো রক্ষা করতে হবে: প্রধান বিচারপতি

হাইকোর্টে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে এক হাজার জামিন আদেশ হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আপিলে আসে ৫০ বা ১০০টা নিয়ে। এখন যদি ১০০, ২০০ ও ৩০০ গ্রাম হেরোইন মামলাতেও জামিন দেয়, তাহলে আমরা কী করবো? দেশটাকেও তো রক্ষা করতে হবে। আমরা কি সেসব জামিন স্থগিত করবো না। আমি তো হাইকোর্টে ছিলাম। আমি আন্দাজে জামিন দিইনি। যেটাতে পাওয়ার মতো, সেটাতে দিয়েছি।

মঙ্গলবার (২ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের এক আবেদন প্রসঙ্গে এমন প্রতিক্রিয়া দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, ১০০ গ্রাম বা তার বেশি পরিমাণ হেরোইনের মামলাতেও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যদি জামিন দেয়, তাহলে চেম্বার আদালত তা স্থগিত ছাড়া কী করবে?

এদিন সকালে আপিল বিভাগের বিচার চলাকালে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল তার একটি মামলায় চেম্বার আদালতের দেয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চান। তখন আপিল বিভাগ সেটি না দিতে চাইলে রুহুল কুদ্দস বলেন, মাই লর্ড, আইটেম নম্বর ১১। মাই লর্ড, আমি চেম্বারে স্টে (স্থগিত) পেয়েছি। এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, চেম্বারে স্টে যেহেতু পেয়েছেন,তাহলে এখন আমরা আপনার এটা ভালো করে দেখি। আপনি এটা আবার হেয়ারিং (শুনানি) করেন।

‘মাই লর্ড, এটা হেয়ারিং করলে একই রেজাল্ট হবে’- প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন আইনজীবী কাজল।
এসময় স্থগিতাদেশ বহাল রেখে আদেশও দিয়ে দেন প্রধান বিচারপতি।

তখন প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে আইনজীবী কাজল বলেন, হাইকোর্টের রুলসটা পরিবর্তন করে দেন। কারণ, আমরা যখন প্র্যাকটিসে আসি তখন থেকে ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তী) অর্ডারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আপিল করতে দেখিনি।

প্রধান বিচারপতি বলেন, শুনেন, হাইকোর্টে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে এক হাজার জামিন আদেশ হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আপিলে আসে ৫০ বা ১০০টা নিয়ে। ১০০, ২০০ ও ৩০০ গ্রাম হেরোইন মামলা যদি জামিন দেয়, তাহলে আমরা কী করব? দেশটাকেও তো রক্ষা করতে হবে। আমি তো হাইকোর্টে ছিলাম। আমি আন্দাজে জামিন দেইনি। যেটাতে পাওয়ার মতো, সেটাতে দিয়েছি।

তিনি বলেন, অথচ হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছে, ব্যাংকের সব ইন্টারেস্ট মাফ। ২০ বছরে টাকা পরিশোধ করবে, তাও শুধু মূল অংশ। এ রকম ইন্টেরিম অর্ডার কি কেউ দিতে পারে? প্রথম দিনেই বলতেছে সমস্ত ইন্টারেস্ট বাদ। এ রকম শুধু একটা না, এ রকম তিনটা কোর্ট আদেশ দিয়েছে। এটা নিয়ে ফুল কোর্ট মিটিংয়ে পর্যন্ত বলা হয়েছে। তারপরও বন্ধ হয়নি।

প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী কাজল বলেন, গরিব আইনজীবীদের কনসার্ন হলো জামিন। সাধারণ আইনজীবী দু-একটা জামিন নিয়ে কাজ করেন।

এ কথার উত্তরে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা তো ১০ হাজার ফেনসিডিল বোতল পর্যন্ত ধরি না। হাইকোর্টে এখন এত আগাম জামিন হয়। এটা আগে দেখেছেন কখনো? এখন প্রত্যেকটা কোর্টেই আগাম জামিন হয়। ধর্ষণ মামলা, খুনের মামলা, হেরোইনের মামলায় যদি আগাম জামিন নিয়ে নেয়, তাহলে আমরা কী করবো? আমাদের আপিলের রায় কি মানে?

তখন আইনজীবী কাজল বলেন, প্রতিটি মামলাতে ভিন্ন ভিন্ন ফ্যাক্ট রয়েছে। এখানে (আপিলে) যত সহজে মামলা নিষ্পত্তি হয়, হাইকোর্টে একটি মামলায় জামিন পাওয়া গলদঘর্ম হয়ে যায়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, হ্যাঁ, গলদঘর্ম হয়ে যায়। হাইকোর্টে প্রতিদিন ৩০০ জামিন হয় আর বলছে গলদঘর্ম হয়ে যায়।

শুনানির এক পর্যায়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ইমান আলী বলেন, মিস্টার রুহুল কুদ্দুস, এই যে ধর্ষণ, হত্যা মামলাগুলা দেখে দেখে স্টে (স্থগিত) দিচ্ছি, এটা কি আনজাস্টিফাই মনে করছেন? ধর্ষণ মামলায়, খুনের মামলায় জামিন দিয়ে দিচ্ছে, সেগুলো এখানে নিয়ে আসবে না?

এসময় আপিল বেঞ্চের আরেক বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান বলেন, মিস্টার রুহুল কুদ্দুস, নিজের চেহারার দিকে তাকান। বারের সেক্রেটারির রুমে বসে কেউ মামলা করেনি। আমরাও বার রিপ্রেজেন্ট করেছি। সভাপতি-সম্পাদকের রুমে মক্কেল জায়গা দিইনি। আপনি দীর্ঘদিন যাবত এখানে বসে প্র্যাকটিস করছেন।

বিচারপতির এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী বলেন, মাই লর্ড, আপনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলছেন।
তখন বিচারপতি নূরুজ্জামান বলেন, আপনিও তো ব্যক্তিগতভাবে কোর্টকে বলছেন।

এরপর আইনজীবী ব্যারিস্টার কাজল বলেন, এখন ভার্চুয়ালি শুনানি হচ্ছে। আপনারা আপনাদের চেম্বারে বসে করছেন। আমি আমার সেক্রেটারির চেম্বারে বসে করছি।, সেক্রেটারির রুম দিয়েছে আপনাকে প্র্যাকটিস করার জন্য’- আইনজীবী কাজলের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি নূরুজ্জামান।

শুনানির এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন আইনজীবী কাজলকে থামিয়ে দেন। তখন প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ কর্মকর্তাকে অন্য আইটেম (অন্য মামলার শুনানি) কল করতে বলেন।

Share this post

PinIt
submit to reddit

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top